কলকাতা ইচ্ছেযাপন সংস্থার ‘দ্বিতীয় আমি’ যেন কাব্য-কবিতার মতো অন্তর ছুঁয়ে যাওয়া নাটক

- Advertisement -

দুলাল চক্রবর্ত্তী 

থিয়েটার জেগে থাক ২৪ ঘণ্টা। দিনভর রাতভর মঞ্চ-পার্বণ। এমনই এক পৌষ পার্বণের অংশ হয়েছিল তপন থিয়েটারে মিউনাস আয়োজিত টানা ২৪ ঘণ্টা নাট্যোৎসব। যার ষষ্ঠ উপস্থাপনা ছিল নাটক ‘দ্বিতীয় আমি’। প্রযোজনা কলকাতা ইচ্ছেযাপন নাট্যসংস্থা। নাটক ও নির্দেশনা জবা শর্মা।

চমৎকার অভিনয়ে বাদল বাবুর চরিত্রাভিনয়ে পাওয়া গেল দেবজিৎ ব্যানার্জীকে। ডিমনেশিয়া আক্রান্ত সাময়িক অস্তিত্ব ভুলে যাওয়া রমা চরিত্রের নারী ভূমিকাটিতে জবা শর্মা রূপদান করেছেন। নাটকে দেখানো হয়েছে, ৬০ বছর বয়সের মহিলা রমা একদিন সকালে কাছাকাছি পার্কে মর্নিং ওয়াকে আসেন। হঠাৎই সেখানে দেখা হয়ে যায় এক গায়ে পড়া আলাপে ইচ্ছুক ব্যক্তি, বাদলবাবুর সাথে। তিনি বিপত্নীক।

আলাপচারিতার শুরুটা হয়েছিল রমার ইচ্ছা-বিরুদ্ধতায়। কিছুটা একাত্মতা ভেঙেই। তাই অল্প বিস্তর ছেঁড়া-ছেঁড়া কথা হয়, যা রমার তেজে জেদে ছিল উচ্চকিত। ভরা ছিল অহং, রাগ আর বিরক্তিতে। যেন তিনি আর সম্পর্কে জড়াতে চাইছেন না। পরিচিতি বাড়াতে বা আলাপের কেন্দ্রে কাউকে পছন্দ করছেন না। তাই হঠাৎই মেজাজ হারিয়ে পার্ক ছেড়ে চলে যান। যাবার সময় নিজের লেখা একটি খাতা পার্কে ফেলে চলে যান।

বাদলবাবু দেখতে পেয়ে তা বেঞ্চ থেকে কুড়িয়ে নিয়ে যান। পরদিনও তাদের একইভাবে দেখা হয়ে যায়। এদিন কিন্তু রমা তুলনায় একেবারে হীম শীতল ঠান্ডা। তিনি আগের দিন কি হয়েছিল, কার সাথে কেন কীভাবে দেখা হয়েছিল, কী কথা হয়েছিল, ইত্যাদি মনে করতে পারছেন না। বাদলবাবুর সাথে আগে দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে, এসব তার মনে নেই।

বোঝা যায় রমা স্মৃতি ধরে রাখতে পারেন না। ভুলে যাচ্ছেন সাম্প্রতিক স্মৃতি। এভাবেই ছন্দ হারিয়ে তিনি জীবন যাপনের চেনা গন্ডি বাইরে চলে গেছেন। মনে নেই প্রায় কোন সম্পর্কই। আছে ছেঁড়া টুকরো কিছু আবেগের ভান্ডার। তাও ঠিকঠাক যখন তখন একই রকমভাবে মনে আসে না। মনের ভিতর উদাসীনতায় ভরা। আছে কিছু অবসাদ। কেননা তিনি আ্যলঝাইমার বা ডিমেনসিয়ার রুগি।

এই ভুলে যাওয়া ব্যাধিতে আক্রান্ত বলেই,…. তার অস্তিত্বে তিনি আরেক স্বত্ত্বা। আজকের কথা যে কাল ভুলে যায়। সে তাহলে কোন সে? এখানে চলে যায় নাটকের মর্মকথা। যার মধ্যে দাঁড়িয়ে কথোপকথনে বাদলবাবু তার একাকী জীবনের আমিত্ববোধের অন্য স্বর শুনতে পান। এভাবেই আসে তৃতীয় দিন। রমা আসেন। সেই একই পার্কে। না, অন্যরকম আজ তিনি। নরম স্বপ্নালু আবেগঘন, যেন হৃদয়ের বড় কাছাকাছি। বাস্তব থেকে পরাবাস্তব আর অবাস্তবতার মাঝামাঝি এক ঢেউয়ে ভেসে চলেছেন মাটিতে পা রেখেই।

কিন্তু গতকাল? একেবারেই ভুলে গেছেন আগের দিনটাকে। এদিনও নারী সঙ্গ বিলাসী এক একক ব্যক্তি বাদলবাবু— এই গুনিতক বিহীন নিস্তরঙ্গ বাদলবাবু কে, এবং কেন তিনি, ইত্যাদিতে তিনিও হয়তো নিজেকে নিয়ে বিচিত্র সমস্যায় পড়েন। কারণ নিজের শব্দের বাস্তবতায় আরেক দ্বিতীয় আমির ছোঁয়া লাগে। পরিচয় বিষয়টা চলে যায় অন্তরলোকের অন্তর্ভুক্ত কামড়ের থমথমে চিন্তায়। আছে দুজনেই, কিন্তু এই চেনার বাইরে আরেক শব্দের ভিতরে। সেখান থেকে ফিরতে না পেরে কেউ-ই কোথায় আছে তা বুঝে পরস্পরকে চিনতে পারেনা।

তথাপি বাদল বাবু অনেক চেষ্টাই করেন। যাতে রমার মনে পড়ে। রমার নিজের খাতাটি খুলে পড়া হয়। তাতে লেখা থাকে অনেক পুরোনো হিসেব। পূরবী লেখা বাদল বাবু পড়েন। কিন্তু কিছুই হয় না। হঠাৎ শেষে একটা লাইন এ এসে বোধহয় রমার কিছু মনে পরে সে তার শারীরিক অস্থিরতায় শেষের লাইনটা সাথে নিয়ে আওড়াতে আওড়াতে বেড়িয়ে যায়। বাদল বাবু শুধু নিঃশব্দে বলেন – ‘রমা ফিরে এসো। তুমি ফিরলে তখন ধোঁয়া বলে ডেকো।’

এমনই একটি কাব্য কবিতার মতো অন্তর ছুঁয়ে যাওয়া নাটক দ্বিতীয় আমি। যদিও কোন নাটুকে দ্বন্দ্ব বা টানাপোড়েন নেই। নেই রমার জীবন বৃতান্ত। ব্যাথা বেদনার্ত ব্যাখা। কেন কিসে এত রিক্ততা সেসব বোঝার তাই রাস্তা নেই। নাটকে আছে শুধুই মুহুর্তের অবস্থা।

কিন্তু বিষন্নতা, অবসাদগ্রস্ততা আ্যলজাইমার রুগীর অন্য এক অবস্থা। শারীরিক মানসিক বিপর্যয়ের প্রাপ্তি। নাটক সেসবের ধার না ধেরে একটি আন্তরিক আবেগকে খুবই প্রাধান্য দিয়েছে। যার সবটা যদিও যুক্তিগ্রাহ্য নয়। কিন্তু অবশ্যই হৃদয় গ্রাহ্য। কবিতার মতো।

নারী পুরুষের কাছাকাছি হতে চাওয়া ইচ্ছা। অজানা অচেনা মিলিত আকাঙ্ক্ষার শব্দের কবিতা। হাত বাড়িয়ে হাত ধরতে চাওয়া। কিন্তু সবই অধরা কল্পনা। বাস্তব ঘাড়ে চেপে মুড়ি ঘন্টো খাওয়াচ্ছে নিজের আদ্যোপান্ত আদ্যাশক্তিতে। তাই নাটক দেখতে বসে নিজের কল্পনায় মনে হচ্ছিল সব কিছু ফেলে চলে যাবার কল্পিত সংলাপ…. ‘চল দুজনে পালাই … কোথায়? … যেখানে হোক… বাড়িতে জানাবো না? … জানিয়ে কেউ পালায় নাকি … তা ঠিক, কোনো মানে থাকে না পালানোর। জানালে তো পালানোর অপমান, বল? … বৃষ্টি পড়ছে! …. পড়ুক। ভিজে যাবো যে…. ক্ষতি কী। কতদিন আর এই বর্তমানে সাঁতার কাটবো। চল, এবার পালাই…ধুয়ে মুছে যাক অতীত। আমাদের আমিটাকে খুঁজে দেখি, সে কি এই আমি, না অন্য …. পালাবো তোকে সাথে নিয়ে, যাবো আরেক জীবনে ….’

এমন অনেক কল্পনায় এই শেষ বয়স, ক্লান্ত বিষন্ন হয়ে, নিজের ভেতরের আলোচনায়  নিজেকেই বেশি বেশি আলোচিত করে। সেখানেই সার্থক তাই ‘দ্বিতীয় আমি’। একটি ভাল ইন্টিমেট থিয়েটার। কিন্তু জবা শর্মার স্বরে চলনে বলনে এই অসংলগ্নতা ঘোর আরও পরিচ্ছন্ন হলে ভাল হবে।

প্রতিটি কাজে, সাব টেক্সটের অনুমোদন দরকার। অসহায়তায় করুণাকর চাহিদায় তিনি যথেষ্ট। নাটক মুহূর্তের ঝর্ণা বটেই। কিন্তু এর কারণ কী? কোন উৎস থেকে নদীর ইচ্ছা হয় এঁকে-বেঁকে চলার? কেন তিনি আর তিনি’তে নেই … যন্ত্রণা কিসে আর কোথায় চাপা পড়ে আছে? তা না বুঝলে যে ভূমিকা নিছকই পাগলাটে হয়ে যায়। এক নারীর এই অবস্থার কাব্যময়তায় পুরুষের অজানা অচেনা অস্তিত্ব সুন্দর এক আকাঙ্খা। কিন্তু ব্যাথায় পুরুষ নেই তো? বড়ই চমৎকার কণ্ঠ দ্যোতক ভূমিকায় আমরা পেলাম অন্য সামর্থ্যের দেবজিৎ বন্দোপাধ্যায়কে। বাদলবাবু সুন্দর সান্নিধ্যকামী অন্তর আলোয় এক অবস্থা জ্ঞাপক ভূমিকা। নাটকের সাফল্যে সংযুক্ত।

গল্প একটু বড়, নানা তরঙ্গে ভাবিয়ে তোলার উপযুক্ত কি করা যায়? নির্দেশিকা নাটককার যদি আর একটু পাগলামি করেন – ক্ষতি কী?

- Advertisement -
সাম্প্রতিক পোস্ট
এধরনের আরও পোস্ট
- Advertisement -