নিজস্ব প্রতিনিধি
মণিপুরের প্রখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব রতন থিয়াম গত বুধবার ভোরে ইম্ফলের এক হাসপাতালে প্রয়াত হয়েছেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৭। দীর্ঘ সময় ধরে অসুস্থ থাকার পর বুধবার ভোর ১-৩০ মিনিটে রিজিওনাল ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্স-এ থিয়ামের মৃত্যু ঘটে।
রতন থিয়ামের শিল্পকর্ম ও সমকালীন ঐতিহ্যের সাথে ধ্রুপদী শিল্পের অনন্য সাধারণ মিশ্রনের এক দক্ষ নাট্য কারিগরের নাম রতন থিয়াম। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বের দরবারে অন্যতম প্রভাবশালী এক নাট্য ব্যক্তিত্ব। ‘চক্রবুহ্য’, ‘উত্তর প্রিয়দর্শী’, ‘অন্ধযুগ’ আর ‘উরুভঙ্গম’ নাট্যকার রতন থিয়ামকে প্রতিষ্ঠিত করে।
থিয়াম মণিপুরী নৃত্যের একজন প্রশিক্ষিত শিল্পী। আবার অন্যদিকে একজন দক্ষ চিত্রশিল্পী সাথে সাথে হিন্দুস্থানী সঙ্গীতের একজন বিশেষজ্ঞ। ১৯৬১ সালে মাত্র বাইশ বছর বয়সে তিনি তাঁর প্রথম উপন্যাস রচনা ও প্রকাশ করেন।
১৯৭৬ সালে ইম্ফলে ‘কোরাস রেপার্টারী থিয়েটার কোম্পানি’ গঠন করেন। দীর্ঘ দিন ধরে তাঁর নাটকগুলি বিশ্বের দরবারে নাটকের সৌন্দর্য ও দর্শন শৈলী দেখিয়ে আপামর দর্স্কের মন জয় করেছেন। তাঁর নাট্য নির্মানে স্থান পেয়েছে স্থানীয় শিল্পকলা। ‘থাং-তা’ (মনিপুরী মার্শাল আর্ট) ও ‘নাট সংকীর্তন’ (স্থানীয় লোকনৃত্য) থেকে উপাদানগুলিকে নিয়ে তাঁর রচনার সাথে প্রয়োগ করেছেন। তাঁর নাট্যের মঞ্চ উপকরণ ও মঞ্চের গঠনেও স্থানীয় শিল্পকলার সম্পুর্ন মিশে গিয়ে তাৎপর্যপুর্ণ প্রয়োগ করেছেন।
তাঁর নাট্যকর্মে মণিপুরের বিদ্রোহ ভীষণভাবে প্রভাব ফেলে। যুদ্ধবিরোধী থিয়াম যুদ্ধ বিষয়ক ভয়াবহতাকে ব্যাখ্যা করে বলেছেন- ‘যুদ্ধ সিসুদের প্রভাবিত করে। যুদ্ধ মহিলাদের প্রভাবিত করে। তাদের পতিতা তৈরি করে। এইসব কোনোভাবে স্বাভাবিক নয়’। যুদ্ধে বিরুদ্ধে তাঁর যুদ্ধ চলেছে, চলবে আগামীতেও। এ প্রসঙ্গে তার মত- ‘মানুষের ক্ষমতা তার চরিত্রকে তুলে ধরে, উন্মোচিত হয় তার স্বরূপ। হ্যা এরাই মানব সভ্যতা এবং এই সুন্দর পৃথিবীকে ধ্বংস করার জন্য যথেষ্ট হিংস্র’।
তাঁর থিয়েটারের কলাকুশলী আধুনিক নাট্যচর্চার সমস্ত প্রকৌশল যথাযথ আয়ত্ব করেছেন। যা তাঁদের প্রযোজনা দেখলেই পরিস্কার অনুধাবন করা যায়। তিনি তাঁর সৃষ্টিতে নিয়ত শিকড়ের প্রতিই অবিচল ছিলেন। ফলে তার নাট্যভাষে এসেছে এক নতুন ঘরানা। যা ভারতীয় নাট্যচর্চাকে প্রতিনিধিত্ব করে।
বাংলায় তাঁর থিয়েটারের সাথে বাঙালীর পরিচয় ঘটে নান্দীকার আয়োজিত জাতীয় নাট্য উৎসবে। যদিও তাঁর সাথে বাংলার যোগসুত্রতা আজন্মের। থিয়েয়ামের জন্মের সময়ে তার মা-বাবা মণিপুরী নৃত্য শিল্পী থিয়াম তরুণ কুমার ও বিলাসিনী দেবী পশ্চিমবঙ্গের নবদ্বীপে ভ্রমণ করেছিলেন। এরপরও তাদের সাথে নানা জায়গায় ঘুরতে ঘুরতে তাঁর দেখা আরো নিবিড় হয়েছে। তিনি নিজেই বলেছেন তার সেই পর্যবেক্ষণে পথচারী থেকে শুরু পুলিশ, কেউই বাদ পরতেন না।
থিয়ামের রাজনৈতিক পাঠ শুরু মুলত বই পড়া থেকে। চে গুয়েভারার বই ছিল তাঁর প্রিয় পাঠ্য। স্বপ্ন দেখতেন ছেলেবেলা থেকেই কিউবা ব্রমণ কএ বিপ্লবী হবেন। এরপর তিনি একজন শিল্পী হিসেবে সমাজে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলীর দ্বারা প্রভাবিত হতেন আর তা তাঁরই নির্মাণে প্রয়োগ করতেন। তাঁর সৃষ্ট মহান ট্র্যাজেডি কর্ণভরম (১৯৭৬) ও উরুভঙ্গম মহাভারতের প্রতিপক্ষ, কর্ণ ও দুর্যোধনকে নায়ক হিসেবে দেখিয়েছে।